ভ্রমণ

সাগরকন্যা কুয়াকাটায়


  • উপমা দত্ত  বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় |
  • প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:২৩
সাগরকন্যা কুয়াকাটায়
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ছবি: উইকিমিডিয়া

ভ্রমণপিপাসু মানুষ হওয়ার সুবাদে ইতোমধ্যেই দেশের বেশ কয়টি জায়গায় ঘোরার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে গত বছর মে মাসে একটি সফরের উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই ভিন্ন। এটি শুধু ভ্রমণ ছিল না; বরং ছিল অজানাকে জানার চেষ্টা, নতুন কিছু অনুধাবন এবং ভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে কাছ থেকে জানার এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। 

আমরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি দল গিয়েছিলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। 

বহুদিনের পরিকল্পনা ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ২৬ মে ২০২৫ তারিখ যাত্রার দিন নির্ধারণ করা হলো। যাত্রার আগের কয়েক দিন ছিল ভীষণ ব্যস্ততায় ভরা। যাত্রার আগে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ শেষ করে রুমে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার ঠান্ডা লাগার প্রবণতা আগে থেকেই ছিল। তার ওপর আবহাওয়াও ছিল প্রতিকূল। পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারলাম, গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। ঠান্ডাও বেড়ে গেছে। তবু প্রস্তুত হয়ে সকাল ছয়টার দিকে বের হলাম। 

আমাদের ক্যাম্পাসের সামনে দিয়ে কুয়াকাটার বাস যায়। সড়কের পাশে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো পরিবহন পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে শরীরের অবস্থাও দ্রুত খারাপ হচ্ছিল। তখন বড় এক দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলাম, যাব কি যাব না? মাঝপথে অসুস্থতা আরও বেড়ে গেলে কী হবে, সেই ভয়ও কাজ করছিল। 

কিছুক্ষণ পর রুমে ফিরে খাবার ও ওষুধ খেয়ে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করলাম। পরে আমরা ছয়জন সকাল সাড়ে আটটার গাড়িতে রওনা দিলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটার উদ্দেশে। পৌঁছাতে দুপুর হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনায় কিছুটা ভাটা পড়ল। দুপুরে খাবার খেতে গিয়ে আমাদের জুনিয়র একটি দলের সঙ্গে দেখা হলো। তারা ট্যুর শেষে বরিশালে ফিরছিল। তাদের সঙ্গে খাওয়া শেষ করে আশপাশের কিছু খোঁজখবর নিয়ে শুরু হলো আমাদের মূল কাজ। 

এখানে পড়ুন: জাপান থেকে ফিরে 

আমাদের গন্তব্য ছিল রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাস করা কয়েকটি এলাকা। স্থানীয় মানুষজন অত্যন্ত আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ ছিলেন। তাদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটালাম, বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করলাম। নতুন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন কমিউনিটি লিডার এবং একজন তরুণ আমাদের বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। 

কাজ করতে করতেই সন্ধ্যা নেমে এল। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে ফিরে এলাম কুয়াকাটার সমুদ্রতীরে। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম রাতের খাবারের জন্য। বারবিকিউ ফিশ দিয়ে রাতের খাবার শেষ করে চন্দ্রবিহীন রাতে কিছুক্ষণ উপভোগ করলাম সমুদ্রের নীরবতা। তারপর ফিরে এলাম রুমে। 

পরদিন সকালে আবার বের হলাম একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। প্রায় এক ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর নাশতা সেরে হোটেল থেকে চেক-আউট করলাম। ব্যাগ রিসেপশনে রেখে রওনা দিলাম দ্বিতীয় দিনের গন্তব্যে। ওষুধ খাওয়ার ফলে শরীর কিছুটা ভালো লাগছিল, যদিও দুর্বলতা আর হালকা জ্বর জ্বর ভাব তখনো ছিল। এরই মধ্যে নিম্নচাপের প্রভাবে আবহাওয়া ক্রমেই প্রতিকূল হয়ে উঠছিল। কিছুক্ষণ পরপরই নেমে আসছিল প্রবল বৃষ্টি। 

সেদিনের কাজ ছিল আরও কঠিন। আগের দিন পরিচিত হওয়া এক রাখাইন তরুণ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও তিনি সময়মতো আসতে পারেননি। ফলে তথ্য সংগ্রহে বেশ সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। পরে তিনি যোগ দেওয়ার পর আমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুটি এলাকায় কাজ শুরু করি। বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত কাজ শেষে আবার ফিরে এলাম সমুদ্রতীরে।

সেদিন দুপুরের খাবার খেয়েই মাত্র দশ মিনিট সমুদ্রের পাশে কাটিয়ে আবার কাজে নেমে পড়েছিলাম। শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ মন্দির এবং আশপাশের রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করলাম। রাত আটটার দিকে হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে রওনা দিলাম বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে। রাত সাড়ে আটটার বাসে যাত্রা শুরু হলো বরগুনার তালতলীর পথে।

তালতলীতে আমার এক বন্ধুর স্থানীয় এক ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। তিনি আমাদের থাকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সবকিছু আগেই গুছিয়ে রেখেছিলেন। রাত প্রায় ১১টার দিকে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেলাম। এরপর দুই দিনের কাজের পর্যালোচনা করে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালেই আবার বের হয়ে পড়লাম। স্থানীয় সেই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলাম রাখাইনপাড়ার উদ্দেশে। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, অজানা তথ্য জানা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির কাছাকাছি পৌঁছানো, সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটি ছিল অসাধারণ। সেদিন আবহাওয়া ছিল সবচেয়ে প্রতিকূল। সমুদ্রে তিন নম্বর সতর্কসংকেত চলছিল, আর সকাল থেকেই হচ্ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। 

বেলা দেড়টার দিকে কাজ শেষ করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জুনিয়রের গ্রামের দিকে রওনা দিলাম। সে বাড়িতে না থাকলেও তার বাবা আমাদের অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের পরিবারের আতিথেয়তা মুগ্ধ করার মতো ছিল। নানা রকম নাশতার আয়োজনের পাশাপাশি তাঁর সহযোগিতায় স্থানীয় বৌদ্ধ মন্দির ও আশপাশের বাড়িগুলোতেও যেতে পেরেছিলাম। 

বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তথ্য সংগ্রহের মূল কাজ শেষ করে ফিরে এলাম হোটেলের কাছে। এত কাজের পর একটু বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া বরগুনার জনপ্রিয় ভ্রমণস্থান নিদ্রার চর ও শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত খুব কাছেই ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, সেখানে একবার ঘুরে আসব।

একটি অটো ভাড়া করে রওনা দিলাম। কিন্তু প্রবল বৃষ্টির কারণে রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে অটোটি মাঝপথেই আটকে গেল। এরপর শুরু হলো কাদামাটির পথ পেরিয়ে হাঁটা। বৃষ্টি, পিচ্ছিল রাস্তা আর ক্লান্ত শরীর, সব মিলিয়ে যাত্রাটি ছিল ভীষণ কঠিন। মাঝপথে পিছলে পড়ে গিয়ে কিছুটা আঘাতও পেলাম। তবু বাকিদের সহযোগিতায় এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে।

নিদ্রার চর ডিসি পয়েন্টে পৌঁছে চারপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। সেখান থেকে কিছু ছবি তুলে স্থানীয়দের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিলাম, নৌকায় জলাশয় পার হয়ে হেঁটে শুভ সন্ধ্যা সৈকতে যাব। প্রথম আধা ঘণ্টা ছিল অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর। এক পাশে সমুদ্র, অন্য পাশে বন, মাঝখানে বৃষ্টিভেজা পথ ধরে হাঁটা। পুরো দৃশ্যটা যেন কোনো সিনেমার অংশ।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যেতে লাগল। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এল। সামনে কোনো আলো কিংবা মানুষের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও ছিল না। এক অজানা আশঙ্কা আমাদের ঘিরে ধরেছিল। তবে এই কঠিন সময়ে পারস্পরিক সাহস, ঐক্য আর একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অনেকটা পথ হাঁটার পর দূরে কিছু আলো দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে বুঝলাম, সেটাই আমাদের রিজার্ভ করা অটো। তখন যেন সবাই প্রাণ ফিরে পেলাম। পরে লোকালয়ে প্রবেশ করার পর স্বস্তিটা আরও গভীর হলো। 

সেদিন দুপুরে খাওয়া হয়নি। হোটেলে ফিরে আমরা সবাই ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত ছিলাম। তবু দ্রুত চেক-আউট করে আবার বাসস্ট্যান্ডের পথে রওনা দিলাম। রাত সাড়ে আটটার বাসে বরিশালের উদ্দেশে ফিরতে ফিরতে আমরা তিন দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলছিলাম। বিশেষ করে শেষ দিনের সেই ভয়াবহ যাত্রার কথা মনে করে সবাই শিউরে উঠছিলাম। তবে সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সবকিছু শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল।

রাত প্রায় ১১টার দিকে বরিশালে পৌঁছে সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খেলাম। এরপর নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেলাম।

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার কাছে নতুন নয়, কিন্তু এই তিন দিন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, এটি শুধু একটি ট্যুর ছিল না; ছিল জীবনের প্রথম গবেষণার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, প্রতিকূল আবহাওয়া, শারীরিক অসুস্থতা, দায়িত্ববোধ আর দলগত ঐক্য, সবকিছু মিলিয়ে এই সফর হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয়। 

এখানে পড়ুন: হিমালয়ের দেশে দুই সপ্তাহ 


ক্যাটাগরি: ভ্রমণ

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট